Skip to main content

প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সেই সব দিন গুলো



খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন সাদ্দাম হোসেন৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজেকে ক্ষমতার একেবারে শীর্ষে৷ ক্ষমতাগর্বী এই মানুষটি ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালান, আক্রমণ করে বসেন কুয়েত৷ তার ফলে ইরাকে চালানো হয় প্রথম মার্কিন হামলা৷ সাদ্দামের একটা বড় ভুল - বহু মুসলিম দেশকেও তিনি তাঁর প্রতি বৈরী করে তুলেছিলেন৷ তবে এটাও ঠিক যে এক সময় ইরানের ইসলামী শাসক গোষ্ঠী সম্পর্কে প্রবল অবিশ্বাসের কারণে ওয়াশিংটন, প্যারিস, মস্কো এবং ইউরোপে অন্যরাও সাদ্দামকে অকুন্ঠ সমর্থন দিয়েছিল৷ শিয়াপ্রধান ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই-এ প্রচ্ছন্ন মদদ ছিল সুন্নিপ্রধান আরব দেশগুলোরও৷ আজকের ইরাকে দখলদার বাহিনীর উপস্থিতিতে শিয়া সুন্নির বিভাজনটা আরো অনেক বেশি স্থায়ী হয়ে গেল সম্ভবত৷

saddamer jiboni 


শেষ মুহূর্তগুলো কেমন ছিল সাদ্দাম হোসেনের? স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে ছয়টার মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত ইরাকী প্রেসিডেন্টকে ফাঁসীকাঠে নিয়ে যাওয়া হয়৷ খুব শা ন্ত ছিলেন তিনি৷ দৃঢ় সাহসী পদক্ষেপে তিনি এগিয়ে যান৷ সেখানে উপস্থিত ছিল শুধু ইরাকীরাই - কোন আমেরিকান - কোন বিদেশী নয়৷ তাঁর শেষ কথা ছিল ইরাকী জনগণকে উদ্দেশ্য করে৷ তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি৷ বলেন, কারো ভয়ে আমি ভীত নই৷

জার্মান রাজনীতিকরা সাধারণভাবে সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসীর সমালোচনা করেছেন৷ বার্লিনে পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জার্মান সরকার তথা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নীতিগতভাবে মৃত্যুদন্ডের বিরোধী - তা সে যে-পরিস্থিতিতেই হোক না কেন৷ বলা হয়েছে, ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে ইরাকী সমাজের সকল অংশকে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমেই শুধু সকল ইরাকীর জন্য উন্নততর ভবিষ্যত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে৷

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সাদ্দামের ফাঁসির ঘটনাকে এক মাইল ফলক বলে অভিহিত করেছেন৷ ইরাকের শিয়া সম্প্রদায় অত্যন্ত খুশি৷ তবে আরব দেশগুলোতে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ৷ ক্ষোভ বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানেও বহু মানুষের মনে৷


ফাঁসির আগে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের একটি কারাগারে বন্দি ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম। জীবনের শেষ কয়েকদিন কেমন কাটিয়েছিলেন সাদ্দাম, তা জানান সেই সময় তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আমেরিকান কারারক্ষী।

উইল বার্ডেনওয়ারপার নামে ওই কারারক্ষী সাদ্দাম হোসেনের জীবনের শেষ কয়েকদিনের অজানা কিছু ঘটনা নিয়ে লিখেছেন দ্য প্রিজনার ইন হিজ প্যালেস : সাদ্দাম হোসেন, হিজ আমেরিকান গার্ডস অ্যান্ড হোয়াট হিস্টোরি লিভস আনটোল্ডনামে একটি বই।

সেই বই ধরেই একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। আর সেখানেই উঠে এসেছে এক সময়ের মার্কিনমিত্র (উপসাগরীয় যুদ্ধের আগের দিনগুলোতে) সাদ্দাম হোসেনের জীবনের শেষ দিনগুলোর অজানা কাহিনী।

কারারক্ষীর ওই বইতে বলা হয়, ফাঁসির আগের দিনগুলোতে সাদ্দাম হোসেন কেক খেতে খুব পছন্দ করতেন। রেডিওতে শুনতেন মার্কিন গায়িকা ম্যারি জে ব্লিজের গান। এ ছাড়া টেলিভিশনে সিসেম স্ট্রিটনামে শিশুদের একটি অনুষ্ঠান বেশ উপভোগ করতেন।
সাদ্দাম হোসেন সকালের নাস্তায় ডিম, কেক ও তাজা ফল খেতেন। তবে ডিমের বিষয়ে নাকি খুবই খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি। ডিম ভাজি সামান্য ছেড়া-ফাটা হলেই ফিরিয়ে দিতেন তিনি।
কারারক্ষী উইল বইতে লেখেন, কারাগারে সাদ্দামের ব্যায়াম করার জন্য একটি নড়বড়ে এক্সাসাইজ বাইকছিল। তিনি সেটিকে খুবই পছন্দ করতেন। আদর করে টাট্টু ঘোড়া বলে ডাকতেন ব্যায়ামের ওই যন্ত্রটিকে। সাদ্দামের কারাগারে এ ধরনের জীবনযাপন দেখে বেশ অবাক হতেন কারাগারের কর্মকর্তারা।
সাদ্দাম হোসেন কারাগারের বন্দিদের হাতে গড়া বাগান খুবই পছন্দ করতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই বইতে। বাগানের ঝোপঝাড়গুলোকেও তিনি সুন্দর ফুলের মতো ভাবতেন।
সাদ্দামের ছেলে উদে হোসেনের কথাও বলেছেন লেখক। উদে তাঁর কাজ-কর্মের জন্য খুবই কুখ্যাত ছিলেন। কারারক্ষীরা যখন নিজেদের সন্তানদের নিয়ে কথা বলতেন তখন সাদ্দাম শোনাতেন উদের কথা। তিনি কারারক্ষীদের বলেন, ‘আমি একদিন উদের ওপর খুব রেগে যাই। তাই আমি তাঁর সব গাড়ি পুড়িয়ে ফেলি।গাড়িগুলোর মধ্যে রোলস-রয়েস, ফেরারি ও পোরশের মতো বিলাসবহুল গাড়িও ছিল বলে জানান সাদ্দাম।

সাদ্দামকে এক রকম ভালোবেসেই ফেলেছিলেন তাঁর পাহারায় থাকা ১২ আমেরিকান কারারক্ষী। আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হওয়া সত্ত্বেও ইরাকের সাবেক এই প্রেসিডেন্টের ফাঁসির দিন খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন তাঁরা।
এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অ্যাডাম রজারসন নামে একজন লেখককে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল আমি পরিবারের একজন সদস্যকে হারিয়েছি। নিজেকে খুনি মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমার আপন কাউকে খুন করেছি।
ফাঁসির পর সাদ্দামের মৃতদেহ বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন লোকজন মৃতদেহে আঘাত করা শুরু করে। এতে হতভম্ভ হয়ে পড়েন ওই ১২ কারারক্ষী। এক রক্ষী এগিয়ে যান তাদের থামাতে। কিন্তু অন্যরা তাঁকে থামিয়ে দেন।
তবে এমনিতেই সাদ্দামকে ভালোবাসেনি তাঁরা। এর পেছনেও আছে অনেক গল্প। একদিন নাকি এক নার্স এসে সাদ্দামকে জানান তাঁর ভাই মারা গেছেন। তখন সাদ্দাম বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি জানান, কোনোদিন যদি তাঁর হাতে টাকা আসে, তাহলে তাঁর (নার্সের) ভাইয়ের সন্তানের সব দায়িত্ব নেবেন তিনি।
সাদ্দাম হোসেনকে ২০০৬ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয় ইরাকের আদালত। তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীপক্ষের ১৪৮ জনের হত্যাসহ শাসনকালে নিষ্ঠুরতা ও ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়।
আশির দশকে তাঁর স্বৈরশাসনকালে দেশের শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগেই মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হন ৬৯ বছর বয়স্ক সাদ্দাম৷ বিচারকাজ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিরূপ সমালোচনাও মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা ঠেকানো সম্ভব হয় নি৷
  সাদ্দাম হোসেনকে মৃত্যুদণ্ডদানকারী বিচারকের ফাঁসি কার্যকর করেছে সুন্নি বিদ্রোহীরা

ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে মৃত্যুদণ্ডদানকারী বিচারক রউফ আবদুল রহমানকে ‘ধরে ফাঁসি কার্যকর’ করেছে দেশটির সুন্নি বিদ্রোহী সংগঠন আইএসআইএস।
সুপ্রিম ইরাকি ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনালের প্রধান হিসেবে ২০০৬ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন আবদুল রহমান। সুন্নি বিদ্রোহীরা গত সপ্তাহে ৬৯ বছর বয়স্ক ওই বিচারককে আটক করে। তবে ইরাক সরকার এখনো তার মৃত্যু নিশ্চিত করেনি। তবে তাকে যে আটক করা হয়েছে, সে খবর অস্বীকার করেনি।
১৬ জুন তাকে আটক করা হয় বলে ধারণা করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর তার মৃত্যু ঘটে এর দুই দিন পর।
জর্দানি এমপি খালিল আত্তিয়া তার ফেসবুক পেইজে লিখেছেন, বিচারক রহমানকে গ্রেফতার ও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শহিদ সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুর বদলা নিতে ইরাকি বিপ্লবীরা তাকে গ্রেপ্তার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
তিনি লিখেছেন, বিচারক রহমান নর্তকীর পোশাক পরে বাগদাদ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সফল হননি।
সাদ্দামের সাবেক সহকারী এবং বর্তমানে বিদ্রোহীদের অন্যতম নেতা ইজ্জাত ইব্রাহিম আল দুরিও বিচারক রহমানকে আটক করার খবর তার ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন।
কুর্দিশ নগরী হালবিয়ায় জন্মগ্রহণকারী বিচারক রহমান ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে সাদ্দামের বিচার করার দায়িত্ব নেন। বিচারকাজ তখন মাঝপথে ছিল। তার আগের বিচারক রিজগার আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি সাদ্দাম হোসেন ও তার সহযোগীদের প্রতি বেশ নমনীয় ছিলেন।
বিচারক রহমান তিন সন্তানের জনক। তিনি ১৯৯৬ সালে কুর্দিশ আপিল কোর্টের প্রধান বিচারক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৮২ সালে ব্যর্থ অভ্যুত্থানে জড়িত সন্দেহে ১৪৮ জনকে হত্যার অভিযোগে সাদ্দামকে ফাঁসি দিয়েছিলেন। ওই রায়ের পর সাদ্দামের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ঈদ উল আযহার দিন সাদ্দামের ফাঁসি দেয়া হয়। 

২০০৩-এর ১৫ই ডিসেম্বর মার্কিন বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি৷ মার্কিন কোয়ালিশন বাহিনী গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাখার অভিযোগে ইরাক আক্রমণ করে৷ কিন্তু সেই অস্ত্র কখনও খুঁজে পায় নি তারা৷ কিন্তু ইতিমধ্যে ইরাক হয়ে উঠেছে নিরন্তর হামলা আর হানাহানিতে পর্যুদস্ত দু:স্বপ্নের এক দেশ৷

Comments